অসহিষ্ণু সমাজে মহানবী (সঃ)-এর আদর্শ : শান্তি ও মানবতার বার্তা

ড. মুহাম্মদ ইউসুফ আলী

আমাদের সমাজে আজকাল এমন কিছু খারাপ প্রবণতা দৃশ্যমান হচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। মানুষের মধ্যে সহনশীলতা কমছে, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সৌহার্দ্য নষ্ট হচ্ছে। সামান্য মতপার্থক্য থেকেই সৃষ্টি হচ্ছে তর্ক-বিতর্ক, গালাগালি, মারামারি ও সংঘর্ষ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একে অপরকে আক্রমণ, অপমান, কুৎসা ও বিদ্বেষ ছড়ানো যেন অনেকের কাছে স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এর পাশাপাশি চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, অপহরণ, প্রকাশ্যে মারধর ও হত্যাকাণ্ডের মতো অপরাধও সমাজে মানুষের নিরাপত্তাবোধকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। গণপিটুনির ঘটনাও গভীর উদ্বেগের বিষয়। এমন এক অসহিষ্ণু ও অস্থির সময়ে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর শিক্ষা আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর জীবন ছিল দয়া, ক্ষমা, ন্যায়বিচার, সহনশীলতা, সত্যবাদিতা ও মানবিকতার উজ্জ্বল আদর্শ।

অনলাইনে অসহিষ্ণুতা ও বিদ্বেষ : নবীর শিক্ষা 

বর্তমান বাংলাদেশের একটি বড় সমস্যা হলো সামাজিক অসহিষ্ণুতা। কেউ আমার মতের সঙ্গে একমত হলেই তাকে শত্রু মনে করা, তার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা কিংবা তাকে অপমান করা-এ ধরনের প্রবণতা সমাজে বাড়ছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর ভয়াবহ প্রকাশ দেখা যায়। একটি ফেসবুক পোস্ট, একটি মন্তব্য কিংবা একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে মানুষ পরস্পরকে অশ্রাব্য ভাষায় আক্রমণ করে। রাজনৈতিক, ধর্মীয় কিংবা ব্যক্তিগত মতপার্থক্য অনেক সময় গালাগালি ও হুমকিতে পরিণত হয়। অনলাইনে ঘৃণামূলক বক্তব্য ও হয়রানির বিষয়টি বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষ উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।

মহানবী (সঃ) আমাদের শিখিয়েছেন সুন্দর ভাষায় কথা বলতে এবং সত্য বলতে। মিথ্যা ও গুজব ছড়ানোর ব্যাপারে মহানবী (সঃ) কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন : “কোনো ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে তাই বলে বেড়ায়।” পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা সতর্ক করে বলেছেন-কোনো ফাসিক ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে এলে তোমরা তা যাচাই করে নাও। আজকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এই হাদিসের শিক্ষা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কোনো সংবাদ বা বক্তব্য যাচাই না করে শেয়ার বা প্রচার করা শুধু অনৈতিক নয়; এটি ব্যক্তি ও সমাজ-উভয়ের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। এই একটি নির্দেশনা যদি আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রয়োগ করি, তাহলে অনলাইন জগতের অনেক বিষাক্ত পরিবেশ দূর করা সম্ভব।

মারামারি ও সংঘর্ষ : নবীর আদর্শ

আজ অনেক সময় তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করে মানুষ একে অপরের ওপর হামলা করে। রাস্তার সামান্য ঘটনা, জমি নিয়ে বিরোধ, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব, পারিবারিক কলহ কিংবা রাজনৈতিক মতপার্থক্য-এসব থেকে মারামারি ও সংঘর্ষ সৃষ্টি হয়। কখনো কয়েকজনের ব্যক্তিগত বিরোধ মুহূর্তের মধ্যে দলীয় সংঘর্ষে রূপ নেয়। মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নেয়। অথচ ইসলাম শান্তি ও সংযমের শিক্ষা দেয়। মহানবী (সঃ) বলেছেন : “শক্তিশালী সে নয় যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; প্রকৃত শক্তিশালী সে, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।” আজ আমাদের সমাজে এই শিক্ষার বিশেষ প্রয়োজন। রাগের মুহূর্তে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং প্রতিশোধের পরিবর্তে ন্যায়সংগত সমাধান খোঁজা মহানবী (সঃ)-এর আদর্শ।

খুন-খারাবি, চাঁদাবাজি ও জীবনের নিরাপত্তা : মহানবীর শিক্ষা 

সমাজে নিরাপত্তাহীনতার আরেকটি কারণ হলো চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই ও চাঁদাবাজি। একজন মানুষ সারাজীবন পরিশ্রম করে যে সম্পদ অর্জন করেন, তা অন্যায়ভাবে কেড়ে নেওয়া শুধু অর্থনৈতিক অপরাধ নয়; এটি মানুষের শান্তি ও নিরাপত্তার ওপরও আঘাত। মানুষের জীবন ইসলামে অত্যন্ত পবিত্র। অথচ আমাদের সমাজে কখনো ব্যক্তিগত শত্রুতা, ব্যবসায়িক বিরোধ, রাজনৈতিক সংঘাত কিংবা অন্যান্য কারণে মানুষ খুন হচ্ছে। কখনো প্রকাশ্য রাস্তায়ও মানুষকে আক্রমণ বা হত্যার ঘটনা ঘটে। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “যে ব্যক্তি কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করল- সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করল (মায়িদা : ৩২)।” এই শিক্ষা মানুষের জীবনের মর্যাদা সম্পর্কে আমাদের গভীরভাবে সচেতন করে।

ভয় দেখিয়ে, হুমকি দিয়ে কিংবা প্রভাব খাটিয়ে কারও কাছ থেকে অর্থ আদায় বা চাঁদাবাজি করা ইসলামের ন্যায়নীতি সম্পূর্ণ বিপরীত। মহানবী (সঃ) মানুষের জান-মাল ও সম্মানের নিরাপত্তাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন। বিদায় হজের ভাষণে তিনি মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মানের মর্যাদা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। অতএব, একজন মুসলিমের পরিচয় শুধু নামাজ-রোজার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তার হাত ও মুখ থেকে অন্য মানুষ নিরাপদ থাকবে-এটিও ঈমান ও উত্তম চরিত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

আমাদের করণীয় :

মহানবী (সঃ)-এর শিক্ষা বাস্তবায়নের জন্য শুধু বক্তৃতা বা আলোচনা যথেষ্ট নয়। আমাদের ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে তা প্রয়োগ করতে হবে। এই পরিস্থিতিতে আমাদের প্রয়োজন শুধু কঠোর আইন নয়; প্রয়োজন নৈতিক ও চারিত্রিক পরিবর্তন। আর সেই পরিবর্তনের জন্য মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর জীবন ও শিক্ষা আমাদের সামনে সর্বোত্তম আদর্শ। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন-রাগের পরিবর্তে সংযম, ঘৃণার পরিবর্তে ভালোবাসা, প্রতিশোধের পরিবর্তে ক্ষমা, জুলুমের পরিবর্তে ন্যায়বিচার এবং বিভেদের পরিবর্তে ভ্রাতৃত্ব।

লেখক : অধ্যাপক, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, অস্ট্রেলিয়া থেকে।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন